শামসুল হুদা লিটন, কাপাসিয়া, গাজীপুর : গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের বহুল পরিচিত গ্রামের নাম নাশেরা।
প্রাকৃতিক ও মনোরম পরিবেশে ইতিহাস, ঐতিহ্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি আর আলোকিত মানুষের সমন্নয়ে গড়ে উঠা এক অনন্য গ্রামীণ জনপদের নাম নাশেরা।
এই গ্রামের রানীগঞ্জ-তারাগঞ্জ সড়কের পাশেই কালের সাক্ষী হয়ে দুইশ বছর ধরে দাঁড়িয়ে আছে বহু পুরণো সেই বট গাছটি। শুধু এটিকে বট গাছ বললে ভুল হবে, এ গাছ যেনো কয়েক শতাব্দীর স্মৃতি।
ছড়িয়ে পড়েছে বট গাছটির বিশাল শাখা প্রশাখা। শিকড় বাকড়ে ছেয়ে গেছে বিশাল এলাকা।
আজও বট গাছটি রয়েছে তাজা তরুণ আর চিরসবুজ। যেন বার্ধক্যের ছাপ একটুও পড়েনি তার গায়ে। তবে বেশ কয়েকবার কাল বৈশাখী ঝড়ে গাছের কিছু ডালপালার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তার পরও গাছের সতেজতা একটুও কমেনি। আর সে কারণেই এ বট গাছকে ঘিরে রয়েছে নানা রহস্য নানা ঘটনা নানা স্মৃতি।
এই বট গাছের দক্ষিণ পাশে ছায়ার নীচেই প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে নান্দনিক স্থাপত্য শৈলীর একটি জামে মসজিদ। উত্তর পাশে নাশেরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। পাশাপাশি রয়েছে নাশেরা উচ্চবিদ্যালয়। আর বট গাছটির পূর্ব পাশে রয়েছে রানীগঞ্জ-তারাগঞ্জ সড়ক।
বট গাছের পশ্চিম পাশে রয়েছে পুরাতন দরগা। এখানে রয়েছে কাপাসিয়া উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব খন্দকার আজিজুর রহমান পেরা’র বংশীয় ও পারিবারিক গোরস্থান। বট গাছের নীচের দরগাকে কেন্দ্র বংশপরম্পরায় প্রচলিত রয়েছে নানা গল্প ও কল্পকাহিনি। এখানকার একটি জীবন্ত পাথরের অলৌকিক গল্প আজও রুপকথার মতো ছড়িয়ে আছে।
এ গাছের নীচের শীতল ছায়ার গল্প যেনো কিংবদন্তি হয়ে আছে। এই ঐতিহাসিক বট গাছটিকে কেন্দ্র করেই শুরু হয়েছিলো নাশেরা গ্রামের বৈশাখী মেলার আয়োজন। বর্তমানে মেলাটি বট গাছ চত্বর ছাড়িয়ে স্কুল মাঠ পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করেছে। এক সময় বট গাছের জ্বিন ভূতের লোমহর্ষক কাহিনি গ্রামের মানুষের লোক মুখে শোনা যেতো। বর্তমানে সেই গল্প ও কল্পকাহিনি বলার লোকজনও হারিয়ে যাচ্ছে।
এ গাছের ডালপালা যেমন চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে তেমনি এর গল্প কাহিনী আর কল্পগাথাও বছরের পর বছর ধরে ডালপালা গজিয়েছে। এসব কারণে এ গাছটিকে দেখতে আসে আশপাশ এলাকার অনেক মানুষ।
গাছটির বিভিন্ন বিষয় পর্যবেক্ষণ করেন অনেক ইতিহাস অনুসন্ধানীরা। এসব বিবেচনায় এলাকাবাসীর দাবি উঠেছে গাছটিকে প্রাচীন ঐতিহ্যের সাক্ষী হিসেবে টিকিয়ে রাখার। মূল্যবান সম্পদ হিসেবেও রক্ষণাবেক্ষণের দাবি সচেতন মহলের। ইতিহাস ঐতিহ্যের অনেক দুর্লভ স্মৃতি এ গাছটি মূল্যবান উপাদান হতে পারে বলে মনে করছেন তারা।
হাজারো পথিক বটগাছের শীতল ছায়ায় বিশ্রাম নেন। ডাল পাতায় পরিপূর্ণ গাছটি যেন পথিকের বিশ্রামের আশ্রয়স্থল। এই বিস্তৃত বটগাছের দৃষ্টিনন্দন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, পাখির কলকাকলি মুখরিত শীতল পরিবেশ বিমুগ্ধ চিত্তকে বিস্ময় ও আনন্দে অভিভূত করে। এ গাছটি শুধু ইতিহাসের সাক্ষী নয় এ যেন দর্শনীয় আশ্চর্য্যের কোন উপাদান। এ গাছটি পথিক, এলাকার মানুষ ও দর্শনার্থীদের কাছে দারুণ আকর্ষণীয়।
নাশেরা গ্রামের শতবর্ষী বয়সী শাহাবুদ্দিন শিকদার বলেন, বাপ দাদার আমল থেকেই দেখে আসছি এই বটগাছ। বাপ-দাদার কাছে শুনেছি এ গাছের ডালপালা কাটা যেত না। এমনকি ভয়ে কেউ পাতাও ধরত না। সেই ভয়ে এখনো অনেকে গাছের ডালপালা ভাঙে না।
প্রকৃতির এক জীবন্ত সাক্ষী এ বটগাছ। এর বিশাল আকৃতি, অগণিত ঝুরি এবং প্রকাণ্ড ছায়ার কারণে এটি আমাদের গ্রামের ঐতিহ্যের প্রতীক। এ অঞ্চলে শতাব্দী প্রাচীন বটগাছটি আজও মানুষের স্মৃতি ও সংস্কৃতির সাথে মিশে আছে।
প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা যায়, একটি পূর্ণবয়স্ক বটগাছ বিপুল পরিমাণ অক্সিজেন সরবরাহ করে পরিবেশকে সতেজ রাখে। একটি পূর্ণবয়স্ক বট গাছ বছরে ২৮ থেকে ৩৫ টন অক্সিজেন ছাড়ে। আর ১০০ বছর পূর্ণবয়স্ক বট গাছ হলে এটা নিশ্চিতভাবেই ৩০ টনের মতো অক্সিজেন সরবরাহ করে।
একজন মানুষের দৈনিক ৫৫০ লিটার অক্সিজেন প্রয়োজন। ৫৫০ লিটার অক্সিজেন সমান ৭৮৬ গ্রাম। একজন মানুষের দৈনিক ৭৮৬ গ্রাম অক্সিজেন গ্রহণ করে। বছরে গ্রহণ করে ২৮৬ থেকে ২৮৭ কেজি অক্সিজেন।
একটা বড় বট গাছ বছরে ৩০ টন অক্সিজেন প্রদান করে। এ হিসেবে ১০০ জন মানুষের শ্বাসপ্রশ্বাসের ব্যবস্থা করে একটি বড় বট গাছ। আর বছরে প্রায় পৌনে তিন টন কার্বন ডাই অক্সসাইড একটা বট গাছ খেয়ে ফেলে।
এরকম একটি গাছ তৈরি হতে ১০০ বছর লাগে যে গাছ একটা ছোট খাটো পাড়ার মানুষের অক্সিজেনের যোগান দাতা। আমাদের গ্রামের এই বট গাছটি বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষের মাঝে নিরলসভাবে অক্সিজেন যোগান দিয়ে যাচ্ছে।
তাছাড়া এই বট গাছটি অসংখ্য পাখি, বাদুড় ও পোকামাকড়ের আশ্রয়স্থল। এর ফল অনেক প্রাণীর প্রধান খাদ্য। যখন গাছে ফল পেকে যায় তখন লাল রঙে ছেয়ে যায় ।
স্থানীয় লোকজন দীর্ঘদিনের স্মৃতি বিজরিত এ গাছটিকে রক্ষণাবেক্ষণের দাবি জানান।