কোন ঘটনা ও বক্তব্য শোনার পর তা যাচাই-বাছাই না করে ঘটনা সম্পর্কে হুট করে মন্তব্য করা বা মতামত দেয়া উচিত নয়।
যে কোনো বিষয়ে সঠিক সত্য উদ্ঘাটনের জন্য ঘটনার আড়ালের ঘটনা, এর কারণ ও তথ্য বিশ্লেষণ করা অত্যন্ত জরুরি।
গুজবে কান না দিয়ে ঘটনাটির সত্যতা অবশ্যই যাচাই করতে হবে। কোন ঘটনার বাদী ও বিবাদীর বক্তব্য পৃথকভাবে শুনে যাচাই করা প্রয়োজন।
উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনলেই দেখা যাবে তাদের দুজনের বক্তব্য ও ঘটনার মধ্যে কোন মিল নেই। ঘটনা ও বক্তব্য পৃথক হওয়ার মূল কারণ হলো তাদের দৃষ্টিভঙ্গি, স্বার্থ।
অনেক সময় উভয়পক্ষই নিজেদের মতো করে বক্তব্য রাখেন। আবার কাউকে ফাঁসাতে পরিকল্পিতভাবে মিথ্যাচার করেন।
পক্ষে রায় পাওয়ার জন্য ঘটনাকে নিজেদের মতো করে উপস্থাপন করেন, যার ফলে তাদের বক্তব্যে বিস্তর ফারাক দেখা যায়। এই বিপরীতমুখী উদ্দেশ্যের কারণে উভয়পক্ষ ঘটনার কেবল নিজেদের অনুকূল দিকগুলোই তুলে ধরেন।
একটি ঘটনা ঘটার সময় উভয়পক্ষের অবস্থান ভিন্ন থাকে। এছাড়া তাদের মানসিক অবস্থা ও উপলব্ধির পার্থক্যের কারণে একই ঘটনা তাদের কাছে ভিন্নভাবে ধরা পড়ে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে একপক্ষ ইচ্ছাকৃতভাবে ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বা পারিপার্শ্বিক অবস্থা গোপন করে যায়, যা অন্যপক্ষ প্রকাশ করে দেয়।
প্রত্যেকটি ঘটনার আড়ালে আসল ঘটনা লুকিয়ে থাকে। আসলে সত্যিটা যেনো সবাই চেপে যাওয়ার চেষ্টা করে। লুকিয়ে রাখে। ধামাচাপা দেয়।
এ ক্ষেত্রে সবাই সমাজের একটি প্রভাবশালী মহলকে ব্যবহার করে থাকেন।
তাই যে কোনো ঘটনার পেছনের আসল সত্য বা লুকানো রহস্য উদঘাটনের জন্য সমাজের একজন সচেতন মানুষ হিসেবে ঘটনা ও বক্তব্যকে নানাভাবে বিশ্লেষণের কৌশল অবলম্বন করতে হবে।
প্রকৃত ঘটনার উৎস যাচাই করতে হবে। তথ্যটি কোথা থেকে এসেছে, কীভাবে এসেছে তা খতিয়ে দেখতে হবে।
আগে ঘটনার খবর বা দাবির পেছনে কোনো পক্ষপাতিত্ব (Bias) বা স্বার্থ আছে কি না তা খতিয়ে দেখতে হবে এবং পরে প্রতিক্রিয়া দেখাতে হবে।
আপনাকে অবশ্যই সত্য ঘটনা জানার জন্য কী (What), কে (Who), কখন (When), কোথায় (Where), কেন (Why) এবং কীভাবে (How)- এই ৬টি প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করতে হবে।
মনে রাখতে হবে, আবেগ বাদ দিয়ে শুধু তথ্য এবং বাস্তব প্রমাণের (Evidence) ওপর ভিত্তি করে ঘটনা মেলানোর চেষ্টা করা আপনার আমার নৈতিক দায়িত্ব।
আমাদেরকে অবশ্যই প্রকাশিত ঘটনা ও বক্তব্যের মোটিভ ও উদ্দেশ্য (Motive) খুঁজে বের করতে হবে।
ঘটনাটি থেকে কার লাভ হচ্ছে বা কে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন তা বিশ্লেষণ করতে হবে। উদ্দেশ্য খুঁজলেই মূল ঘটনার রহস্য বেরিয়ে আসবে।
কারো বক্তব্য ও ঘটনাটি নিয়ে অন্যান্য প্রত্যক্ষদর্শী, বিশেষজ্ঞ বা ভিন্নমতাবলম্বীদের মতামত নেয়া প্রয়োজন। কোন অপরাধমূলক ঘটনার রাজনৈতিক ট্যাগ দেয়ার প্রবণতা আমাদের সমাজে অহরহ দেখা যাচ্ছে।
অনেক সময় পারিবারিক বিরোধিতার কারণে ঘটনাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার জন্য রাজনৈতিক পরিচয়কে সামনে আনা হয়। জমি নিয়ে দ্বন্দ্ব, প্রতিহিংসা, পারিবারিক বিরোধকে রাজনীতিকরণ করে ব্যক্তি স্বার্থ হাছিলেরও অপচেষ্টা করা হয়।
কোনো অপরাধমূলক ঘটনার রাজনৈতিক ট্যাগ বা পরিচিতি দেয়া হলে বিচার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি সমাজে বিভাজন ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। অপরাধকে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার ফলে ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার কিংবা নির্দোষ ব্যক্তির উপর জুলুম নিপিড়ন হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
রাজনৈতিক প্রলেপের কারণে সমাজে বিচারহীনতার সংস্কৃতি গড়ে উঠে।
অপরাধী যে দলেরই হোক না কেন, রাজনৈতিক তকমা পেলে অনেক সময় দলীয় ছত্রচ্ছায়ায় তারা পার পেয়ে যায় বা বিচারের মুখোমুখি হতে দেরি হয়।
রাজনৈতিক তকমার কারণে নিরপরাধ ব্যক্তি হয়রানির শিকার হওয়ার আশংকা তৈরি হয়। রাজনৈতিক বিরোধ বা প্রতিহিংসা মেটানোর জন্য অনেক সময় সাধারণ বা নির্দোষ মানুষদের অপরাধের সাথে জড়িয়ে দেয়া হয়, যা চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং নীতি নৈতিকতা বিরোধী।
রাজনৈতিক চাপের কারণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে বা সত্য উদঘাটন করতে সমস্যার সম্মুখীন হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে রাজনৈতিক কারণে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করতে সমস্যায় পড়তে হয়।
রাজনৈতিক ট্যাগ যুক্ত হলে ঘটনাটি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যেও রাজনৈতিক মেরুকরণ বা বিভেদ তৈরি হয়, যা সামাজিক সম্প্রীতি নষ্ট করে। এতে সামাজিক ঐক্য বিনষ্ট হয়।
রাজনৈতিক পরিচয়ে অপরাধীরা পার পেয়ে গেলে সমাজে অন্যান্য অপরাধীরাও উৎসাহিত হয় এবং অপরাধের হার বৃদ্ধি পায়। এমনটা মোটেই গণতান্ত্রিক সভ্য সমাজের জন্য কাম্য হতে পারে না।
তাই কোন ঘটনা ও বক্তব্য শোনার পর তাৎক্ষণিক মন্তব্য না করে নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ঘটনার চূলচেরা বিশ্লেষণ ও বস্তুনিষ্ঠ তদন্ত সাপেক্ষে মতামত প্রকাশ করতে হবে। এমনটি হলে সমাজে সাম্য ভ্রাতৃত্ব ও শান্তি বিরাজ করবে।
লেখক: অধ্যাপক শামসুল হুদা লিটন, সাংবাদিক ও কলামিস্ট