শেখ মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন, সম্পাদক : ২০২৬ সালের শুরু থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে ইরানের যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, বর্তমানে পরিস্থিতি একটি অস্থিতিশীল যুদ্ধবিরতি (Stalemate & Ceasefire) এবং কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনী যৌথভাবে ইরানে বড় ধরণের বিমান হামলা (অপারেশন এপিক ফিউরি) চালানোর পর এই যুদ্ধের সূত্রপাত হয়।
বর্তমানে (জুন ২০২৬) যুদ্ধক্ষেত্রের সর্বশেষ পরিস্থিতি নিচে তুলে ধরা হলো:
১. অনির্দিষ্টকালের যুদ্ধবিরতি ও তার লঙ্ঘন। গত এপ্রিল মাসের শুরুতে (৭–৮ এপ্রিল) পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় আমেরিকা এবং ইরানের মধ্যে একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়েছিল।
পরবর্তীতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই যুদ্ধবিরতির মেয়াদ অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়িয়ে দেন। তবে কাগজে-কলমে যুদ্ধবিরতি থাকলেও মাঠপর্যায়ে এটি পুরোপুরি কার্যকর হচ্ছে না। দুই পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলছে।
২. পারস্য উপসাগরে “দ্বিমুখী অবরোধ” (Dual Blockade) বর্তমানে মূল উত্তেজনা চলছে সমুদ্রপথ নিয়ে।
আমেরিকার নৌ-অবরোধ : আমেরিকা ও তার মিত্ররা ইরানের ওপর কঠোর নৌ-অবরোধ আরোপ করে রেখেছে। সম্প্রতি (২ জুন) মার্কিন নৌবাহিনী ইরান অভিমুখী একটি তেলবাহী ট্যাংকার বিকল করে দেয়।
হরমুজ প্রণালী সংকট : ইরান বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল পরিবহন পথ ‘হরমুজ প্রণালী’ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার ঘোষণা দিয়েছে এবং সেখান দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে। ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, যুদ্ধের আগের স্বাভাবিক অবস্থায় হরমুজ প্রণালীকে আর ফিরিয়ে দেয়া হবে না।
৩. লেবানন ইস্যু এবং আলোচনার অচলাবস্থা :
কূটনৈতিক আলোচনার টেবিলে বর্তমানে বড় ধরণের অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।
লেবানন বিতর্ক : ইরান ও হিজবুল্লাহ বর্তমানে মূল আলোচনাকে হরমুজ প্রণালী বা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি থেকে সরিয়ে লেবানন যুদ্ধের দিকে নিয়ে যেতে চাচ্ছে। ইরান শর্ত দিয়েছে, লেবাননে সম্পূর্ণ যুদ্ধবিরতি না হওয়া পর্যন্ত তারা আমেরিকার সাথে অন্য কোনো বিষয়ে (যেমন পারমাণবিক চুক্তি) আলোচনা করবে না।
হিজবুল্লাহর অবস্থান : ৪ জুন হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে মার্কিন-ইসরায়েলি যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।
তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, হিজবুল্লাহ নিজে থেকেই যুদ্ধ থামানোর আগ্রহ দেখাচ্ছে।
আটকে থাকা অর্থ মুক্তি : ইরান দাবি করেছে, যেকোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি সই হওয়ার আগেই বিদেশে আটকে থাকা তাদের বিলিয়ন ডলারের সম্পদের অন্তত অর্ধেক অবমুক্ত করতে হবে।
৪. বৈশ্বিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব
৩ মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা এই যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট ও তেলের বাজারে বড় ধরণের অস্থিরতা চলছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় (পেন্টাগন) ইতিমধ্যেই এই যুদ্ধে ২৯ বিলিয়ন ডলারের বেশি খরচ করে ফেলেছে এবং আরও ২০০ বিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত বাজেট দাবি করেছে।
সারসংক্ষেপ : সরাসরি বড় আকারের বিমান বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা সাময়িকভাবে কমলেও, হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ এবং লেবাননে হিজবুল্লাহর ওপর হামলা বন্ধ করা নিয়ে আমেরিকা ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধ পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে।